জুলাই–আগস্ট ২০২৪ সালের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR) একটি তথ্য-অনুসন্ধানী দল গঠন করে। এই দল ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে সীমিত পর্যায়ে সরেজমিনে পরিদর্শন চালায় এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এই প্রতিবেদন ব্যাপক গুরুত্ব পায়। তবে দেশের গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ—সরকারি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক ঝুঁকি কিংবা জনমতের ভয়ে—থাকার কারণে প্রতিবেদনের এমন অংশই বেশি প্রচারিত হয়েছে, যা তৎকালীন সরকার ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যায় বা ইচ্ছা করেই প্রতিবেদন কে আওয়ামিলীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ করা হচ্ছে।
OHCHR প্রতিবেদনের ২২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৫ আগস্টের পর সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের “বিপরীত ভীতি” কাজ করেছে। অনেকেই এমন কিছু প্রকাশে সতর্ক থেকেছেন, যা আওয়ামী লীগের পক্ষে বা তাদের বিরোধীদের সমালোচনামূলক বলে মনে হতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই বোঝা যায় যে তথ্য পরিবেশ নিজেই একটি আলোচনার বিষয়।
প্রতিবেদনটিতে প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে উল্লেখযোগ্য বিতর্ক রয়েছে। OHCHR অনুমান করেছে যে ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১৪০০ জন নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা নির্ধারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৮৪১ জনের তথ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (NSI) ৩১৪ জনের তথ্য যুক্ত করা হয়েছে, যা মোট ১১৫৫ হয়। তবে বাকি সংখ্যাটি অনুমাননির্ভর বলে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়নি—চিকিৎসা ব্যবস্থার চাপ, দ্রুত দাফন এবং ভয়ের কারণে।
অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মৃতের সংখ্যা ৮৩২ বলে জানায় এবং জুলাই শহীদ ফাউন্ডেশন ৮২০ জনের কথা বলে। কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন দাবিও উঠে এসেছে যে তালিকায় এমন ব্যক্তিও থাকতে পারেন, যারা অন্য কারণে মারা গেছেন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে জীবিত ব্যক্তির নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ একটি জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ১৩০টি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে, প্রায় ৭৮% মৃত্যু আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে, যা সাধারণত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্র। তবে বাকি ২২% মৃত্যুর বিস্তারিত কারণ স্পষ্ট নয়। ব্যাপক ময়নাতদন্ত না হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে সহিংসতার পেছনে শুধু রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, অন্যান্য গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাও থাকতে পারে। কিছু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জঙ্গি সংগঠনের নাম আলোচনায় এসেছে, যারা নিজেদের সম্পৃক্ততার দাবি করেছে। একই সঙ্গে বেওয়ারিশ লাশের বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—যাদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। এ বিষয়ে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগের কথাও বলা হলেও বাস্তব অগ্রগতি স্পষ্ট নয়।
৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ও সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যা আত্মরক্ষামূলক ছিল কি না—তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই ধরনের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে সব মৃত্যুর দায় একতরফাভাবে নির্ধারণ করা সঠিক বিশ্লেষণ নাও হতে পারে।
সার্বিকভাবে, এই প্রতিবেদনকে ঘিরে মূল বিতর্ক দাঁড়িয়েছে তিনটি বিষয়ে: (১) নিহতের প্রকৃত সংখ্যা, (২) মৃত্যুর কারণ ও দায় নির্ধারণের পদ্ধতি, এবং (৩) তথ্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা। বিভিন্ন পক্ষের দাবি-প্রতিদাবির মধ্যে একটি নিরপেক্ষ, যাচাইকৃত ও পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানই প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারে—এমনটাই অনেক বিশ্লেষকের মত।