বর্তমান সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, যা দেশের ইতিহাসে প্রথম এমন দৃষ্টান্ত।
তিনি আরও বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং এরপর টানা সময় ধরে সরকার পরিচালনা করে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক যুগের বেশি সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে, পাশাপাশি জনগণের জীবনমানও উন্নত হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে এবং তা জনগণের প্রয়োজনেই ব্যয় করা হচ্ছে। সরকার মানুষের কল্যাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কাউকে অযথা কষ্টে পড়তে দেওয়া হবে না বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
তিনি জানান, বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে কয়েক মাসের খাদ্য আমদানি করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত তিন মাসের খাদ্য আমদানির সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের রিজার্ভ দিয়ে আরও বেশি সময়ের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
চাল, গম, ভোজ্যতেল, জ্বালানি ও ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে এই রিজার্ভ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কোভিড-১৯ মোকাবিলা, ভর্তুকি প্রদান, উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধের কারণেও রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তিনি অতীতের রিজার্ভ পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরে বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় রিজার্ভ তুলনামূলক কম ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহের কারণে রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যদিও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তা কিছুটা কমেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন সংগ্রহ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয়ের চাপও রিজার্ভে প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সরকার উচ্চমূল্য দিয়েও খাদ্যশস্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করছে, যাতে দেশের মানুষের সরবরাহে ঘাটতি না পড়ে। এ ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি অব্যাহত রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই রিজার্ভ কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু দেশ বাংলাদেশ থেকে সহায়তা চেয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে দেশের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী জমি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। এক ইঞ্চি জমিও ফেলে না রেখে চাষাবাদে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে গুজব ছড়ানোর বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে ঘরে রাখার প্রবণতা ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে অপরাধের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার চেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান। যেখানেই তারা থাকুক, তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন। বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়; সুযোগ পেলে তারা নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।
সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বাচিপের সভাপতি এম ইকবাল আর্সলান এবং মহাসচিব এম এ আজিজ। অনুষ্ঠানে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন এবং পরে সংগঠনের স্থায়ী কার্যালয়ের উদ্বোধন করেন।