লাল বলের ক্রিকেটে একসময় যাদের নিয়ে রীতিমতো ব্যঙ্গ করা হতো, সেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বমঞ্চে সমীহ জাগানো এক নাম। দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ৯ উইকেটের বিশাল জয়—এটি শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল নয়, বরং দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা। বিদেশের মাটিতে একসময় টেস্ট জয় যেখানে ছিল সোনার হরিণ, সেখানে ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে দাপুটে এই জয় প্রমাণ করে— বদলে গেছে বাংলাদেশ। ‘মিনোজ’ তকমা ছুড়ে ফেলে প্রতিপক্ষের মাটিতে পরাশক্তিদের শাসন করার কৌশল এখন টাইগারদের বেশ ভালোভাবে জানা।
শুরুর দিকের পরিসংখ্যান দেখলে যে কারোরই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে বাধ্য। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে প্রথম অ্যাওয়ে টেস্ট জয়ের আগে বিদেশের মাটিতে রীতিমতো ধুঁকতে হয়েছে বাংলাদেশকে। প্রথম ৩০টি অ্যাওয়ে টেস্টের মধ্যে ২৮টিতেই হারের তিক্ত স্বাদ পেতে হয়েছিল। সেসময় অবস্থা এমন ছিল যে, বিশ্ব ক্রিকেটের বিভিন্ন পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের নাম আলাদা করে রাখতেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
তবে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা দারুণ রোমাঞ্চকর। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে— নিজেদের খেলা সর্বশেষ ১০টি অ্যাওয়ে টেস্টের ৪টিতেই জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ! শুধু তাই নয়, শেষ ১৭টি অ্যাওয়ে টেস্টের মধ্যে ৬টিতে জয় এসেছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, টেস্ট ফরম্যাটে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা এখন কতটা পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী।
অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে তাদের ঘরের মাঠে হারানো যেকোনো দলের জন্যই স্বপ্নের মতো। কিন্তু বাংলাদেশ সেই অসাধ্য সাধন করেছে মাত্র তৃতীয়বারের চেষ্টাতেই! ডারউইনে প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্কদের মতো তারকা বোলারদের সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই দাপট দেখানো বাংলাদেশ মাত্র সাড়ে তিন দিনেই ম্যাচ নিজেদের পকেটে পুরে নেয়। প্রথম ইনিংসে পেসার হাসান মাহমুদ ও দ্বিতীয় ইনিংসে স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণি জাদুর পাশাপাশি ব্যাটারদের দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স এই জয়ে বড় ভূমিকা রাখে। মাত্র ৫৭ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মুমিনুল হকের জয়সূচক বাউন্ডারিটি যেন জানান দিল— পেস কিংবা বাউন্সি উইকেট, কোনো জুজুই আর আটকাতে পারবে না টাইগারদের।
বিদেশের মাটিতে টেস্ট জয়ের মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৬টি দেশে নিজেদের পতাকা উড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তিনটি জয় এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে। এছাড়া পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়েতে দুটি করে এবং শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় একটি করে টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ।
সবচেয়ে আশাজাগানিয়া বিষয় হলো— একসময় যেসব দেশে গেলে বড় ব্যবধানে হারের শঙ্কা থাকতো, সেখানে এখন দ্রুতই জয় ধরা দিচ্ছে। এখন টাইগারদের সামনে কেবল তিনটি দুর্গ জয় করা বাকি— ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইংল্যান্ড। আগামী বছরই ইংল্যান্ড সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশ দলের। ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশা, ডারউইনের এই আত্মবিশ্বাস সঙ্গী করে ক্রিকেটের তীর্থভূমিতেও হয়তো নতুন ইতিহাস গড়বে বাংলাদেশ।
একটা সময় যারা বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, ডারউইনের এই জয় তাদের জন্য মোক্ষম এক জবাব। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটাররা এটিকে নিজেদের জন্য ‘লজ্জার’ বললেও, বাংলাদেশের জন্য এটি দীর্ঘদিনের কাঠখড় পোড়ানো পরিশ্রমের ফসল। ডারউইনে রচিত হওয়া এই মহাকাব্য বিশ্ব ক্রিকেটকে একটি বার্তাই দিচ্ছে— লাল বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং যেকোনো দলকে তাদের মাটিতেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
You cannot copy content of this page