দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে মুখে হাসি ফুটতে শুরু করেছে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের। বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা পেতে শুরু করেছেন তারা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে আবেদনকারী প্রায় সব শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাদের পাওনার একাংশ পাঠানো হচ্ছে।
অবসর গ্রহণের পর নিজেদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পেতে এই শিক্ষকদের মাসের পর মাস, এমনকি বছর পেরিয়ে গেলেও ঘুরতে হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে এই টাকা প্রদানের প্রক্রিয়াটি প্রায় থমকে ছিল বললেই চলে। মূলত, ২০১৫ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো চালু হওয়ার পর থেকেই এই টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে ধীরগতি দেখা দেয়।
শুধু ধীরগতি নয়, এই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগও বেশ পুরোনো। অনেককে তাদের নিজেদের টাকা তুলতেই ঘুষের দ্বারস্থ হতে হতো। সম্প্রতি খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট ফান্ডের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অবসরের পর জীবনের শেষ বেলায় এসে টাকা না পেয়ে শিক্ষকদের মধ্যে যে ক্ষোভ ও চরম হতাশা তৈরি হয়েছিল, সরকারের বর্তমান উদ্যোগে তা অনেকটাই প্রশমিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশের বর্তমান বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষকদের এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
গত শনিবার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের এই অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা প্রদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেদিনই আবেদনকারীদের অ্যাকাউন্টে টাকা ছাড় করা শুরু হয় এবং মোবাইলে মেসেজ দিয়ে তাদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
তবে শিক্ষকরা তাদের পাওনার পুরোটা একবারে পাচ্ছেন না, আপাতত একাংশ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষকদের পুরো পাওনা মেটাতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ বরাদ্দের প্রয়োজন। শিক্ষকরাও চাইছেন, দ্রুত যেন তাদের বকেয়া টাকার পুরোটাই পরিশোধ করা হয়।
কতজন পাচ্ছেন এই সুবিধা?
অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, এবার মোট ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক ও কর্মচারীকে অবসর সুবিধার একাংশ দেওয়া হচ্ছে। এর পেছনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যারা আবেদন করেছিলেন, মূলত তারাই এই টাকা পাচ্ছেন।
ইতোমধ্যেই অনেকের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে গেছে। যারা পাননি, তাদেরও পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। তবে প্রায় চার হাজারের বেশি আবেদনকারীর ফরমে বিভিন্ন অসম্পূর্ণতা বা ভুল থাকায় তাদের টাকা আপাতত আটকে আছে।
অন্যদিকে, কল্যাণ সুবিধার ক্ষেত্রেও একই নিয়মে একাংশের টাকা দেওয়া হচ্ছে। মোট ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা ছাড় করেছে কর্তৃপক্ষ। নিয়ম অনুযায়ী, একজন শিক্ষক অবসর সুবিধার পাশাপাশি কল্যাণ সুবিধাও পেয়ে থাকেন। চাকরি জীবনে শিক্ষকদের বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদার টাকা থেকেই মূলত এই সুবিধা দেওয়া হয়।
জানা গেছে, কল্যাণ সুবিধার ক্ষেত্রে একেকজন শিক্ষক সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন। আর অবসর সুবিধা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে চার লাখ টাকা। ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত যারা কল্যাণ সুবিধার জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদেরকেই এই টাকা দেওয়া হচ্ছে।
বোর্ডে বাড়ছে ভিড়
এদিকে, টাকা না পাওয়ার কারণ জানতে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে অবস্থিত কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের কার্যালয়ে ভিড় জমাচ্ছেন অনেক শিক্ষক ও তাদের স্বজনরা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য নিখুঁতভাবে যাচাই করা হয়। ফলে আবেদনে খুব সামান্য ভুল থাকলেও টাকা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভুল সংশোধনের পর আবেদন করলে পুনরায় টাকা পাঠানো হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন কর্মকর্তারা।